বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আসছে বড় পরিবর্তন। চলমান পুরানো কাঠামোকে ঢেলে সাজিয়ে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে পারার মতো করে সাজানো হচ্ছে নতুন শিক্ষা কাঠামো। এতে বড় পরিবর্তন দেখা যাবে পিইসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরিক্ষার ক্ষেত্রে!
১২.০৯.২০২১ তারিখ সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখা হাসিনার কাছে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা উপস্থাপন করেন যাতে প্রধানমন্ত্রী খসড়া অনুমোদন দেন। পরবর্তীতে সচিবালয়ের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নতুন শিক্ষা কাঠামোর বিস্তারিত আলোচনা করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।
কী আছে নতুন ও পরিমার্জিত জাতীয় শিক্ষাক্রমে?
- সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে প্রাথমিক সমাপণী পরিক্ষা (পিইসি) ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরিক্ষা (জেএসসি) পরিক্ষায়। নতুন রূপরেখা অনুযায়ী ২০২৩ সাল থেকে পিইসি ও জেএসসি পরিক্ষা ব্যবস্থা আর থাকছেনা। সাময়িক পরিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ৫ম থেকে ৬ষ্ঠ এবং ৮ম থেকে ৯ম শ্রেণিতে উন্নীত হবে।
- তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত হবেনা কোনো বার্ষিক পরিক্ষা। এক্ষেত্রে প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত হবে শতভাগ শিখনকালীয় মূল্যায়ন। অর্থাৎ, শিক্ষকের মূল্যায়নের মাধ্যমে পরের শ্রেণিতে পদোন্নতি দেওয়া হবে শিক্ষার্থীদের।
- ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা মোট ৮টি বিষয়ে পড়াশোনা করবে। বিষয়গুলো হলো- বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা, ধর্ম শিক্ষা এবং শিল্পকলা। বিষয়গুলোর মধ্যে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানে পরীক্ষায় মূল্যায়ন হবে ৪০ শতাংশ। আর বাকি ৬০ শতাংশ মূল্যায়ন করা হবে শিখনকালীন সময়ে। আর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা, ধর্ম শিক্ষা এবং শিল্পকলা এই বিষয়গুলোর মূল্যায়ন হবে শতভাগ শিখনকালীন সময়ে।
- ৬ষ্ঠ থেকে থেকে ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা মোট পড়াশোনা করবে ১০টি বিষয়ে। বিষয়গুলো হলো- বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, ডিজিটাল প্রযুক্তি, জীবন ও জীবিকা, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ধর্ম শিক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি।
- ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ে পরীক্ষায় মূল্যায়ন করা হবে ৬০ শতাংশ। আর বাকি ৪০ শতাংশ মূল্যায়ন করা হবে শিখনকালীন সময়ে। বাকি ৫টি বিষয়ের মূল্যায়ন হবে শতভাগ শিখনকালীন সময়ে।
- নবম-দশম শ্রেণির বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগগুলো আর থাকছেনা। সবার জন্য থাকবে একটি সমন্বিত পাঠ্যক্রম।
- ৯ম ও ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ে পরীক্ষায় মূল্যায়ন করা হবে ৫০ শতাংশ। আর বাকি ৫০ শতাংশ মূল্যায়ন করা হবে শিখনকালীন সময়ে।
- ৯ম ও ১০ম শ্রেণির ডিজিটাল প্রযুক্তি, জীবন ও জীবিকা, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ধর্ম শিক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি এই বিষয়গুলোর হবে না কোনো পরীক্ষা। অর্থাৎ, মূল্যায়ন হবে শতভাগ হবে শিখনকালীন।
- মোট পাবলিক পরিক্ষা হবে তিনটি
- এসএসসি-ই হবে প্রথম পাবলিক পরিক্ষা।
- এসএসসি পরিক্ষা হবে দশম শ্রেণি শেষে দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচির ওপর।
- ১১শ ও ১২শ শ্রেণিতে থাকছে বিভাগ নির্বাচনের সুযোগ। এক্ষেত্রে আবশ্যিক বিষয়ে শিখনকালীন মূল্যায়নে ৩০ শতাংশ ও সামষ্টিক মূল্যায়নে থাকবে ৭০ শতাংশ নম্বর। নৈর্বাচনিক বা বিশেষায়িত বিষয়ে কাঠামো ও ধারণায়ন অনুযায়ী সামষ্টিক মূল্যায়নের পাশাপাশি প্রকল্পভিত্তিক, ব্যবহারিক ও অন্যান্য উপায়ে শিখনকালীন মূল্যায়নের সুযোগ থাকবে। প্রায়োগিক বিষয়ে (প্র্যাকটিক্যাল) শিখনকালীন মূল্যায়ন হবে শতভাগ।
- একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ্যসূচির ওপর প্রতি বর্ষ শেষে একটি করে পরীক্ষা হবে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার ফলাফলের সমন্বয়ে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারিত হবে।
কবে থেকে এই নতুন রূপরেখা অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে?
- আগামী বছর ২০২২ সাল থেকে নতুন শিক্ষা রূপরেখা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পাইলটিং শুরু হবে। এতে ১০০টি প্রাথমিক ও ১০০টি মাধ্যমিক স্কুলে নতুন শিক্ষাক্রম পরীক্ষামূলকভাবে চালু হবে ১ম ও ৬ষ্ঠ শ্রেণির মধ্য দিয়ে।
- ২০২৩ সালে প্রথম ও দ্বিতীয় এবং ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে শুরু হবে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন।
- ২০২৪ সালে তৃতীয় ও চতুর্থ এবং ৮ম ও ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা নতুন শিক্ষাক্রমের আওতায় আসবে।
- ২০২৫ সালে পঞ্চম ও ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা আসবে নতুন শিক্ষাক্রমের আওতায়।
- ২০২৬ ও ২০২৭ সালে যথাক্রমে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা নতুন শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত হবে।
- নতুন শিক্ষাক্রম ২০২৭ সাল থেকে সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হবে।
কী পরিমাণ সময় পাবে শিক্ষার্থীরা?
বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে সরকারি ছুটি ও দুই দিন করে সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে মোট ১৩৭ দিন বন্ধ পাবে শিক্ষার্থীরা। সেই হিসেবে ১৮৫ দিনের পাঠদান হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। ১৮৫ দিনের মধ্যে প্রতিদিন শিখনঘন্টা ঠিক করা হয়েছে-
- প্রাক-প্রাথমিকের জন্য আড়াই ঘণ্টা
- প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির জন্য সাড়ে তিন ঘণ্টা
- চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির জন্য চার ঘণ্টা
- ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির জন্য পাঁচ ঘণ্টা
- নবম ও দশম শ্রেণির জন্য সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা
- একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির জন্য সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা

