গণিতশাস্ত্রে আমরা চারটি মৌলিক প্রক্রিয়া চিহ্নের কথা জেনে থাকি ছোটবেলা থেকেই। যোগ-বিয়োগের পাশাপাশি গুণ-ভাগ নিয়েও গণিতশাস্ত্র পাঠের শুরুতেই আলোচনা শুরু হয়। তবুও গুন ও ভাগ নিয়ে অনেকের ভীত খুব নড়বড়ে। সেই ভীত শক্ত করতে না পারলে পেশাজীবন ও সাধারণ জীবন দুই ক্ষেত্রই ক্ষতির মুখোমুখি হতে পারে। তাই আজ আমরা গুণ ও ভাগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করব গুণ ও ভাগ নিয়ে।
গুণ
গুণ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনায় জাওয়ার আগে জানা যাক আসলে গুণ কাকে বলে। গুণ হলো যোগের সংক্ষিপ্ত রূপ। অর্থাৎ একাধিক সংখ্যাকে দ্রুত ও সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে যোগ করে ফলাফল বের করাই হলো গুণের কাজ। একটি গুণের তিনটি অংশ থাকে- গুণ্য, গুণক ও গুণফল। এ তিনটি অংশ নিয়ে আলোচনা করা হবে ইতিহাস জানার পর।
গুণের ইতিহাস
আমরা যে বহুল প্রচলিত (x) এক্স বা ক্রস চিহ্ন দিয়ে গুণ বোঝাই, একে অনেকে বলেন ক্রুস অব সান আন্দ্রেস। প্রাচীন কালে গুণের কাজ করতে অনেক গণিতবিদ অনেক প্রক্রিয়ায় করলেও, এই গুণের জন্য ক্রস চিহ্নটি মূলত প্রথম সপ্তদশ শতাব্দীর ১৬১৮ সালে ব্রিটিশ গণিতবীদ উইলিয়াম আউটরেড (William Oughtred) ব্যবহার করেন। কিন্তু জার্মান গণিতবীদ গটফ্রিড লাইবনিজ (Gottfried Leibniz) এই ক্রস (x) চিহ্ন পছন্দ না করার কারণে নিজে গুণের জন্য ডট (.) চিহ্নের ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে দুটি চিহ্নই গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ায় এই দুটি চিহ্ন দিয়ে সারা দুনিয়ায় গুণের কাজ হয়ে থাকে।
কীভাবে গুণ করা হয়?
আমরা আগেই বলেছি যে, গুণ মূলত যোগের সংক্ষিপ্ত রূপ। আবার আমাদের আলোচনায় আমরা গুণের তিনটি অংশের কথাও বলেছি। এই তিনটি অংশ নিয়ে গুণ কীভাবে হয় সেটাই এখন আলোচনার বিষয়।
গুন্য: যে সংখ্যাটিকে গুণ করা হয়, তাকে গুণ্য বলা হয়।
গুণক: যে সংখ্যাটি দ্বারা গুণ করা হয়, তাকে গুণক বলা হয়।
গুণফল: গুণ্য ও গুণকের মধ্যকার গুণের ফলে প্রাপ্ত ফলাফলকে বলা হয় গুণফল।
একটি উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা যাক-
৫ x ৩ = ১৫
প্রথম সংখ্যাটি গুণ্য। অর্থাৎ, ৫ কে গুণ করা হবে। ৩ হলো গুণক। অর্থাৎ, ৩ দ্বারা গুণ করা হবে। গুণের ফলাফল বা গুণফল হলো ১৫। এই যে ১৫ হলো এখানেই হচ্ছে যোগের সংক্ষিপ্ত কাজ। এখানে আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে,
গুণক যা থাকবে, গুণ্যকে গুণকের সাথে ততবার যোগ করতে হবে
যেমন- উপরের গুণক হলো ৩। গুণ্যকে বলা হয়েছে গুণকের সাথে ততবার যোগ করতে। সেক্ষেত্রে গুণ্য হলো ৫। এখন ৫ তিনবার যোগ করলে আমরা ১৫ পেয়ে যাব। একই ভাবে যদি আমরা ‘৭ x ৬’ বিবেচনা করি, তাহলে ৭-কে ৬ বার যোগ করলে আমরা গুণফল ৪২ পাব।
গুণ আমরা কয়েকটি নিয়মেই করতে পারি। সাধারণত আমরা উপরে-নিচে গুণের নিয়ম অনুসরণ করে থাকি। এক অংক বিশিষ্ট গুণ্য ও গুণক হলে খুব সহজেই আমরা গুণের নামতা ব্যবহার করে বা উপরের নিয়মে যোগ করেই কাজ করে ফেলতে পারব। কিন্তু যখন আমরা বড় সংখ্যা গুণ করতে যাব, অর্থাৎ, দুই বা ততোধিক অংক বিশিষ্ট সংখ্যা গুণ করব, তখন বিশাল যোগ করাও অনেক কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাই, গুণের সঠিক নিয়মে আমরা সহজে কাজ করে থাকি। একটি উদাহরণে যাওয়া যাক-

- এখানে ৮৫৩৬ গুণ্য এবং ৯৭২ গুণক
- আমাদেরকে সবসময় এককের নিচে একক, দশক অংকের নিচে দশক স্থানীয় অংক…এভাবে বসাতে হবে।
- গুণকের ডানপাশ থেকে গুণ শুরু হবে
- গুণ্যের ডানপাশ থেকে বামপাশে যেতে হবে গুণ করতে করতে
- প্রথমে ২ দ্বারা ৬ কে গুণ করার পর গুণফল ১২ হবে। ১২ এর একক ঘরের মান বসিয়ে দশক ঘরের মানকে পরবর্তী ঘরের যোগফলের সাথে যোগ করতে হবে।
- ২ কে পরবর্তীতে ৩ এর সাথে গুণ করার ফলে গুণফল ৬ পাওয়া যায়। আগের ঘরের দশক স্থানের মান ‘১’ এবার ৬ এর সাথে যোগ হয়ে ‘৭’ হলো।
- এভাবে করে ২ এর সাথে ৫ ও পরবর্তীতে ৮ গুণ করা হলো।
- সর্ব বামের সংখ্যার সাথে গুণ করার পর যা হবে তা বসিয়ে দিতে হবে। আগের ঘরের যা থাকবে তাও যোগ করে দিয়ে মূল গুণফল পাওয়া যাবে প্রথম লাইনে।
- পরবর্তী ধাপে ৭০ দ্বারা গুণ করা হবে। কারণ। ৭ এর স্থানীয় মান ৭০। আমরা সবসময় স্থানীয় মান দ্বারা গুণ করব।
- কিন্তু আমরা দ্বিতীয় লাইনে ‘ধূসর রঙ’ করা একটি শূন্য দেখতে পাচ্ছি। সংক্ষিপ্ত নিয়মের গুণে আমরা একটু পর শিখব যে, শেষে শূন্য বিশিষ্ট সংখ্যা হলে, শূন্য বাদ দিয়ে গুণ করা যায় এবং গুণ শেষে মোট যতটি শুন্য রয়েছে, গুণফলে ততটি শূন্য পরে বসিয়ে দেয়া যায়।
- এক্ষেত্রে তাই আগেই আমরা বামে একটি শূন্য বসিয়ে পরবর্তীতে আগের নিয়মে গুণ করেছি।
- তৃতীয় ধাপে ৯০০ দ্বারা গুণ হওয়ার কারণে আমরা দুটি শূন্য বসিয়ে আগের মত ৯ দ্বারা গুণ করেছি।
- খেয়াল রাখতে হবে- স্থানীয় মান অনুযায়ী একটি অংকের নিচে একই স্থানীয় মানের আরেকটি অংক বসবে।
- সর্বশেষ তিনটি ধাপের যোগফলই হবে আমাদের নির্ণেয় গুণফল।
পাশাপাশি গুণের ক্ষেত্রে আমরা প্রথম সংখ্যাটিকে গুণ্য এবং পরবর্তী সংখ্যাকে গুণক ধরে উপরে নিচে স্থানীয় মান অনুযায়ী বসিয়ে উপরোক্ত নিয়ম অনুসারে গুণ করতে পারব।
সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে গুণ

- শূন্য ছাড়া সংখ্যা ডান থেকে বাপে একক, দশক,… স্থান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে
- সাধারণ নিয়মে গুণ করে মোট যতটি শূন্য রয়েছে তা যোগ করে গুণফলের সাথে বসিয়ে দিতে হবে।
- বামপাশের সমাধানে মোট তিনটি শূন্য এবং ডানপাশের সমাধানে দুটি শূন্য বসানো হয়েছে।
গুণের সূত্রাবলী
- গুণফল =গুণ্য × গুণক
- গুণক = গুণফল ÷ গুণ্য
- গুণ্য= গুণফল ÷ গুণক
গুণ নিয়ে আজকের আলোচনা এই পর্যন্ত থাক। পরবর্তী পর্বে আলোচনা করা হবে ভাগ নিয়ে, যেখানে থাকবে গুণ ও ভাগের মধ্যকার সম্পর্ক ও বিভিন্ন সমস্যা সমধানে ভাগ সম্পর্কিত সূত্র।

